সোনারগাঁ সংবাদদাতা
সোনারগাঁয়ে কাঁচপুর ইউনিয়নের পাঁচপাড়া এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মো. আসলাম সানি (৪৮) ও শফিকুল ইসলাম রনি (৩৫) নামের দু’ভাইকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী হত্যাকান্ডে জড়িতদের বাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এতে করে তাদের ২টি বসত ঘরসহ ১০টি ভাড়া দেয়া কক্ষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে এসময় কেউ বাড়িতে ছিলোনা। ঘর তালাবদ্ধ ছিলো। রোববার (২৬ ফেব্রæয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কাঁচপুর ইউনিয়নের পাঁচপাড়ার ২নং ওয়ার্ডের মৃত সানাউল্লাহর ছেলে আসলাম সানী ও শফিকুল ইসলাম রনিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সন্ধ্যার পর থেকে স্বজন ও এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তারা তালাবন্ধ ঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে করে নিহতের চাচা মহিউদ্দিনের ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাছাড়া পার্শ¦বর্তী গাছপালাও পুড়ে যায়। আগুনে বাড়িঘরের আসবাবপত্রসহ মূল্যবান জিনিসপত্র পুড়ে ভষ্মিভূত হয়ে যায়। বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার খবর পেয়ে সোনারগাঁ থানা পুলিশ রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন। পুলিশ আসার আগেই বাড়িঘর আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এলাকাবাসী জানায়, দু’টি হত্যাকান্ডের বিষয়ে পুলিশের কড়া নজরধারী থাকা দরকার ছিল। হত্যকান্ডের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলেও পরবর্তীতে তারা চলে যায়। এমন সুযোগে নিহতদের বিক্ষুব্ধ স্বজনরা অভিযুক্তদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের সচেতনার অভাবে বিক্ষুব্ধরা আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে। কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাসান খাঁন বলেন, হত্যাকান্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে বাড়ি চলে যাওয়ার পর জানতে পারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে আগুন দিয়ে সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। পরে বিদ্যুৎ অফিস ও তিতাস গ্যাস অফিসে খবর দিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, অগ্নিকান্ডের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে, ৩ ছেলেকে নিয়ে কাঁচপুরের পাঁচপাড়া এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন জহুরা বেগম। কিন্তু এক ঘটনাতেই নিমেষেই শেষ হয়ে গেলো গোটা পরিবার। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ২ ছেলে খুন হন। আর মেজ ছেলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ২ সন্তানকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় ষাটোর্ধ্ব জহুরা বেগম। সোমবার (২৭ ফেব্রæয়ারি) সকালে কাঁচপুর পাঁচপাড়া এলাকায় নিহতদের বাড়িতে গিয়ে শোকের মাতম দেখা যায়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে এলাকা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জহুরা বেগম বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেলো, আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো? আমার নাতি-নাতনিরা কাকে বাবা বলে ডাকবে? ওদের এখন কে দেখবে? আল্লাহ কেন আমাকে এত বড় শাস্তি দিলো। সামান্য জমি নিয়ে ওরা আমার সন্তানকে এভাবে খুন করতে পারলো। আল্লাহ ওদের মাফ করবে না। আমি ওদের ফাঁসি চাই। আর কিছু চাই না আমি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতদের বোন শামসুন্নাহার বলেন, ৫ মিনিটের মধ্যে ভাইগো কোপাইয়া নির্মমভাবে মাইরা ফেললো। মার্চের ২ তারিখ আমাগো হজে¦ যাওয়ার কথা ছিল। রনিরও যাওয়ার কথা ছিল। এটা আল্লাহ আমাগো কোন হজে¦ পাঠাইয়া দিলো।
অপরদিকে, মাত্র ১৪ মাস বয়সী আনাস আহমেদ আদনানের সারাদিন বাবার সঙ্গে খুনসুটিতেই সময় কাটতো। কিন্তু রোববার থেকে বাবাকে না পেয়ে অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে গেছে অবুঝ শিশুটি। খাচ্ছেও না ঠিকমতো। বারবার ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে ডাকছে। শিশু আনাস শফিকুল ইসলাম রনির ছেলে। সোমবার দুপুরে কথা হলে নিহত রনির স্ত্রী ও আনাসের মা সানজিদা আক্তার বিলাপের সুরে বলেন, গতকাল থেকেই বাবাকে কাছে না পেয়ে ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে। ভালো করে কথা বলতে না পারলেও বারবার ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে ডাকছে। ছেলেকে এখন কী জবাব দেবো আমি? আমি তো একা হয়ে গেলাম। আমার ছেলেকে কীভাবে মানুষ করবো? আড়াই বছর আগে সানজিদা আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় রনির। সুখেই দিন কাটছিলো তাদের। বিয়ের এক বছর পর ঘরের মুখ উজ্জ্বল করে জন্ম নেয় আনাস। তবে এক বছরের মাথায় বাবাকে হারালো শিশুটি। সানজিদা আক্তার আরো বলেন, আনাস ওর বাবার ভক্ত বেশি। বাবাকে না পেয়ে গতকাল থেকেই ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। সামান্য জমি নিয়ে এভাবে জলজ্যান্ত দু’টো মানুষকে হত্যা করে ফেললো ওরা? আল্লাহ ওদেরকে ছেড়ে দেবে না। আমার ছেলেকে যারা বাবাহারা করেছে তার কঠিন বিচার আল্লাহ একদিন না একদিন করবেই। প্রসঙ্গত, রোববার দুপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মো. আসলাম সানি (৪৮) ও শফিকুল ইসলাম রনি (৩৫) খুন হন। তাদের আরেক ভাই রফিকুল ইসলাম (৪০) আহত হন। পাঁচপাড়া এলাকার ওই ৩ ভাইয়ের সঙ্গে চাচা মো. মহিউদ্দিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিলো। তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে সরকারি একটি সড়কের ড্রেন করা হচ্ছিলো। ওই ড্রেনের জায়গা নিয়েই তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে।ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত মোস্তফা (৪০), মামুন হোসেন (৩৫), মফিজুল ইসলাম (২৫), মারুফসহ (১৮) পরিবারের সবাই পলাতক রয়েছেন।
নিহতদের স্বজন আবু নাইম মিয়া জানান, পাঁচপাড়ার ২নং ওয়ার্ডের মৃত সানাউল্লাহর ছেলে আসলাম সানী ওই এলাকার গ্রাম্য চিকিৎসক আতাউর রহমানের কাছ থেকে ৩ শতাংশ জমি ক্রয় করে। এ জমিসহ পার্শ্ববর্তী আরও একটি জমি দাবি করে তার চাচা মহিউদ্দিন, চাচাতো ভাই মোস্তফা, মামুন ও মারুফ। এ নিয়ে আসলাম সানী, শফিকুল ইসলাম রনি ও রফিকুল ইসলামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দ্ব›দ্ব চলছিল। নাইম মিয়া আরও জানান, তাদের জমির পাশ দিয়ে সরকারি অর্থায়নের ৩ লাখ ১১ হাজার ২৪১ টাকা ব্যয়ে এলজিএসপি-৩ এর আওতায় খাস পাড়া আলী হোসেনের বাড়ি থেকে হারুনের বাড়ি পর্যন্ত আরসিসি ও ড্রেন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এ ড্রেন মহিউদ্দিনের জায়গার ওপর দিয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করেন তারা। এ নিয়ে চাচা মহিউদ্দিনের সঙ্গে আসলাম সানীর তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে চাচাতো ভাই মোস্তফার নেতৃত্বে তারা আসলাম সানী, শফিকুল ইসলাম রনি ও রফিকুল ইসলামকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে আহত করেন।সোনারগাঁ থানা পরিদর্শক (তদন্ত) আহসান উল্লাহ বলেন, মরদেহগুলো এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজে আছে। ময়নাতদন্তের পর তাদের নিজ বাড়িতে আনা হবে। এ ঘটনায় থানায় এখনো কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। ঘটনার পর থেকে জড়িতরা সবাই পলাতক আছেন। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।এদিকে, ২ ভাইকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম (পিপিএম, বিপিএম বার)। সোমবার দুপুরে নিহতদের বাড়িতে যান তিনি। পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল (পিপিএম), সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মাহাবুব আলম, পরিদর্শক (তদন্ত) আহসান উল্লাহ, কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা।
গোপনীয়তা নীতি | এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।